শনিবার , ডিসেম্বর 15 2018
হোম / অন্যান্য / সম্পাদকীয় ও মতামত / পরকীয়ায় ঐক্যফ্রন্ট, ভাঙছে কি বিএনপি?

পরকীয়ায় ঐক্যফ্রন্ট, ভাঙছে কি বিএনপি?

সায়েদুল আরেফিন:

অনেক দেশে এখন সীমিত আকারে হলেও গাঁজা বিক্রি ও সেবন বৈধ। বাংলাদেশে একসময় গাঁজার বিপুল চাষ ও বিক্রি হতো, এখন বন্ধ। তবে অবৈধ পথে গাঁজা বিক্রি ও সেবন বন্ধ নেই। তাই বাংলাদেশের ভোটের আকাশ বাতাস মনে হচ্ছে রাজনৈতিক গাঁজার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, ক্ষমতায় যাবার নেশায় বুদ হয়ে আছে অনেকেই। নভেম্বরের মাঝামাঝি এবং গত রোববার প্রকাশিত দুটি খবর পাশাপাশি রেখে পড়লে এমনই মনে হচ্ছে।

আগের খবরে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্নার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে বলে জানানো হয় গত নভেম্বরে। বিশ্বজুড়ে চলা `হ্যাশট্যাগ মিটু’তে মান্নার যৌন হয়রানির ঘটনাগুলো তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছেন দেশি কিছু প্রাক্তন জাসদ-বাসদ কর্মী।

একজন প্রাক্তন নারী জাসদ কর্মীর বক্তব্যের সূত্র ধরে জনপ্রিয় এক অনলাইন পোর্টালের অনুসন্ধানে পায় চাঞ্চল্যকর তথ্য। বয়স্ক রাজনীতিকগণ সবাই জানেন জাসদ থেকে বেরিয়ে আ. ফ. ম মাহাবুবুল হকের নেতৃত্বে গঠিত হয় বাসদ। মাহমুদুর রহমান মান্না, আখতারুজ্জামান, জিয়া উদ্দিন আহমেদ বাবলু, আলী রিয়াজের মতো তৎকালীন সময়ের তুখোড় ছাত্রনেতারা জাসদ ছেড়ে বাসদে চলে যান। যদিও মান্না সাহেবের ইতিহাস ভিন্ন।

মাহমুদুর রহমান মান্না ইসলামী ছাত্রসংঘ (বর্তমানে শিবির), ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ, জাসদে যোগ দেওয়ার কিছুদিন পরেই, ‘জাসদ সমাজতান্ত্রিক শ্রেণি চরিত্র হারিয়েছে’ বলে বাসদে যান। প্রাক্তন বাসদের অনেক নেতাই মনে করেন, জাসদ থেকে বাসদের জন্ম ছিল আদর্শিক। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব প্রশ্নে তাঁদের মতপার্থক্য হয়েছিল। কিন্তু মার্কসবাদী সংগঠন হিসেবে আবির্ভাবের কিছুদিনের মধ্যে ভাঙন ধরে নবগঠিত বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলে (বাসদ) ।

বাসদের প্রাক্তন এবং বর্তমান একাধিক নেতা জানান, বাসদ কোনো আদর্শিক কারণে নয়, স্রেফ মান্নার পরকীয়া এবং লাম্পট্যের কারণে ভেঙেছে। বাসদের আহ্বায়ক প্রয়াত আ. ফ. ম. মাহাবুবুল হকের স্ত্রী কামরুন্নাহার বেবীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে মানে পরকীয়ায় জড়িয়েছিলেন মান্না। এই সম্পর্কে হাতেনাতে ধরাও পড়েন তিনি।

এ সময় নীতি নৈতিকতার প্রশ্নটি সামনে আসে। কমরেডের স্ত্রীর সঙ্গে যে অনৈতিক সম্পর্কে জড়াতে পারে, সে কীভাবে শোষণহীন আদর্শিক রাজনীতি নিয়ে মানুষের সামনে দাঁড়াবে? – এই প্রশ্ন নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয় বাসদের পলিট ব্যুরোতে (সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী সংস্থা)। দীর্ঘ ১৮ ঘণ্টার নীতি নির্ধারণী সভায় বেরিয়ে আসে মান্নার বিরুদ্ধে একাধিক যৌন নিপীড়নের অভিযোগ, তাঁর লাম্পট্য। এ সময় মান্নার ‘অরাজনৈতিক সুলভ’ আচরণের জন্য বাসদ ভেঙে বেরিয়ে যান কমরেড খালেকুজ্জামান। ঐ ১৮ ঘণ্টার বৈঠকের বিবরণীতে পাওয়া যায়, মান্নার বিরুদ্ধে ৮ জন নারী ‘অশোভন’ এবং ‘অশ্লীল’ আচরণের অভিযোগে বাসদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তাঁদের অধিকাংশই এখন দেশের বাইরে।

গত রোববারের আরেকটি খবরে বলা হয়েছে, রাতের অন্ধকারেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব ছিনতাই হয়ে গেছে। ড. কামাল হোসেনকে হটিয়ে ফ্রন্টের মূল নেতা হয়েছে তারেক জিয়া। তারেক বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুলকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ২০ দলের শরিক এবং ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়ন চাহিদার তালিকা যেন তাঁকে দেওয়া হয়। এই তালিকা থেকে তারেক জিয়াই ঠিক করবেন ২০ দল এবং ঐক্যফ্রন্টের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা। অথচ, দুদিন আগেই সিদ্ধান্ত ছিল অন্যরকম। মাতিঝিলে ড. কামাল হোসেনের চেম্বারে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সবাই একমত হয়েছিল যে, শরিকদের আসন বণ্টন চূড়ান্ত হবে ঐক্যফ্রন্টের বৈঠকে। ঐক্যফ্রন্টকে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক দেওয়ার ঘোষণার পরপরই পাল্টে যেত থাকে দৃশ্যপট। পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসেন তারেক জিয়া। শরিকদের অন্তত দুই নেতাকে তিনি বাগে আনেন। তারেক জিয়ার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর, গতরাতে ঐক্যফ্রন্টের সভায় বিএনপির পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়, মনোনয়ন চূড়ান্ত করবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এসময় গণফোরাম ছাড়া ঐক্যফ্রন্টের কোনো শরিকই এর প্রতিবাদ করেননি। গতরাতেই এটা নিশ্চিত হয়ে গেছে যে, শেষ পর্যন্ত যদি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট জয়ী হয়, তাহলে যেই প্রধানমন্ত্রী হোক আসল নেতা হবেন তারেক জিয়া।

ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে জয়ী হলে ঐ সরকারের প্রথম কাজ হবে তারেককে দেশে ফেরানো। তাঁর মামলা প্রত্যাহার এবং তাঁকে প্রধানমন্ত্রী বানানো। এই কাজ সম্পন্ন হলেই ঐক্যফ্রন্টকে ‘গলা ধাক্কা’ দেওয়া হবে বলেই মন্তব্য করছেন বিএনপির অনেক নেতা। বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের মূল আপত্তির জায়গা ছিল তারেক জিয়া। এই প্রেক্ষাপটেই ড. কামাল হোসেনকে সামনে আনা হয়। সবাইকে দেখানো হয়, তারেক এবং জিয়া পরিবারের অধ্যায় শেষ। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে নতুন বিএনপি আত্মপ্রকাশ করেছে। যে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে। কিন্তু দলের কর্তৃত্ব জিয়া পরিবারের বাইরে যাওয়ার আগেই, নেতৃত্ব নিয়ে নিলেন তারেক জিয়া। এখন তাঁর নির্দেশেই চলবে ঐক্যফ্রন্ট। বিএনপির একাধিক নেতা বলেছেন, ‘টাকা দিয়েই আমরা ড. কামাল কিনেছি। কাজেই তিনি তারেক জিয়ার নির্দেশেই কাজ করবেন।’

এর ফলশ্রুতিতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার  সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। সম্প্রতি ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়ন নিয়ে নানান রকম টানাপোড়েন, শরিকদের অযৌক্তিক দাবি, বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের আলাদা করে সাক্ষাৎকার গ্রহণ, সাক্ষাৎকার গ্রহণ অনুষ্ঠানে বিএনপির পলাতক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়ার উপস্থিতির ইত্যাদি সব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ড.কামাল হোসেন নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা গেছে। ড.কামাল হোসেন জানেন যে, আদালতের ২০১৫ সালে আর এই মাসের দুটি আদেশ নির্বাচন কমিশন আমলে নিলেই তারেক জিয়ার ক্ষমতা শেষ। কিন্তু দুনিয়ার সবাই জানেন যে, তারেক জিয়া খুব বিপজ্জনক মতাদর্শী ব্যক্তি, যার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হচ্ছে আন্ডার ওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিম।

বিএনপি কয়েকটি ব্যক্তি নির্ভর দলের সঙ্গে এই ঐক্যের মূল উদ্দেশ্যই ছিল, নিজেদের খারাপ ইমেজ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া। কেননা, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়ার খারাপ ইমেজ শুধু বাংলাদেশেই না বিশ্বব্যাপী। এছাড়াও ২০০২ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাকালীন বিএনপির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিসহ নানারকম অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অনেক অভিযোগ প্রমাণ হয়ে তারেক জিয়াকে আদালত শাস্তি দিয়েছে, কিন্তু তিনি পলাতক। কাজেই বিএনপি তার অতীতের অপকীর্তি আড়াল করার জন্যই আর দলে ভাঙ্গনের কিছু আইনি জটিলতার শঙ্কা থেকে বর্ম হিসেবে ড. কামাল হোসেন, আ. স. ম. আবদুর রব, মাহমুদুর রাহমান মান্নাদেরকে ঐক্যের নামে দলে ভেড়ান। মূলত এইসব প্রচেষ্টাই নায়ক ছিলেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান। তারেকের অপকীর্তি আড়াল করতেই তারা যোগ দিয়েছিলেন ঐক্যফ্রন্ট ও যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে। বিএনপির ইমেজ ক্লিন করার জন্য গত ছয় মাস ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন তারা। কিন্তু হঠাৎ করেই প্রার্থী নির্বাচনে তারেকের এমন একতরফা প্রভাব বিস্তারে হতভম্ব হয়ে গেছেন খোদ মির্জা ফখরুল ও ড. মঈন খানও।

তবে যে ঐক্যফ্রন্ট দুইজন নেতার সহায়তায় তারেক জিয়া ড. কামালকে ল্যাং মারলেন বলে মনে হচ্ছে তার মূলে একজন যে মাহমুদুর রহমান মান্না তা প্রায় সকলেই নিশ্চিত হয়ে গেছেন। কারণ মান্না সাহেবের অতীত ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় যে, তিনি জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ, জাসদ, বাসদ (খালেক), বাসদ (মাহবুব), ‘জনতা মুক্তি দল’, আওয়ামী লীগ, ‘নাগরিক ঐক্য’ দলের সাবেক নেতা থেকে বর্তমানে খালেদা–তারেক– মীর্জা–মওদুদ এর চেয়ে বড় নব্য বিএনপি নেতা। তাই মান্না অবশ্যই বিএনপির ‘ধানের শীষ’মার্কা নিয়ে নির্বাচন করবে। এক জীবনে, ১০ দল করা, ষড়যন্ত্র করে দল বদল করা ছাড়া এই ভাইবার মান্নার আর কি কোন চয়েস আছে?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তারেক ঘনিষ্ঠ বিএনপি’র এক নেতা বলেন, তারেক জিয়া বহুগামী মান্নাকে খুব ভালো করেই চেনেন। বিলেতি পরিকল্পনায় তাই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তারেক জিয়ার দখলে দিতে ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম বেতারে হানাদার বাহিনীর প্রচার সেলে কাজ করা মাহমুদুর রহমান মান্না রাজনৈতিক পরকীয়ার আশ্রয় নিয়েছে। তাতে অবশ্য তারেক জিয়ার অনেক কাঠখড়ি পুড়াতে হয়েছে, গুনতে হয়েছে অনেক কড়ি, মান্নাদের পিছনে, সহায়তা করেছে পাকিস্তান। তবুও তারেক ভয়ে আছেন যে মান্নার রাজনৈতিক পরকীয়ার ফর্মুলায় কি শেষে বাসদের মত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে, বিএনপিতে ভাঙ্গন দেখা দেয়! আলামত কিন্তু আছে, তার। নিরুপায় তারেকের কাছে ঝুঁকি নেওয়া ছাড়া আর কোন পথ খোলা নেই।

লেখক: কলামিস্ট – Bangla Insider

 

সব সময় আপডেট নিউজ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন- সবুজ বিডি ২৪

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।