রবিবার , ডিসেম্বর 16 2018
হোম / অন্যান্য / সম্পাদকীয় ও মতামত / ‘মি-টু’ মুভমেন্ট : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

‘মি-টু’ মুভমেন্ট : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

মিথুন রায়:

কখনও কখনও উচ্চারিত কিছু শব্দবন্ধ দেশ-কাল-সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। যে শব্দের অভিঘাত শুধু সুদূরপ্রসারীই হয়। যে শব্দের ব্যঞ্জনা অনেক সময় জীবনের অনেক গোপন সত্য উদ্ঘাটনেও আমাদের সাহসী করে তোলে। সাম্প্রতিককালে বিশ্ব বাতাসে ঝড় তোলা তেমনই এক শব্দবন্ধ ‘#মি টু’।

১৯৯৭ সালে সমাজকর্মী টারানা বার্ক যখন ১৩ বছরের এক কিশোরীর মুখে তার ওপর যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতার কথা শুনেছিলেন, তখনই তাঁর বুকের ভেতর জন্ম নিয়েছিল ওই ‘মি টু’। পরে যৌন হিংসার বিরুদ্ধে তাঁর প্রচার আন্দোলনের নামও বার্ক রাখেন ‘মি টু’, অর্থাৎ ‘আমিও’ যৌন হেনস্তার শিকার।

২০০৬ সালে আফ্রো আমেরিকান সামাজিক আন্দোলনের কর্মী তারানা বুরকি নারী অধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে নারীর ওপর যৌন নিপীড়নের বিষয়ে প্রথমবারের মতো ‘মি টু’ ধারণার কথা বলেন, পরে একই নামে একটি প্রামাণ্যচিত্রও নির্মাণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরে হলিউড অভিনেত্রী অ্যালিসা মিলানো প্রযোজক হার্ভে ওয়েনস্টেইনের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে সোস্যাল মিডিয়ায় ‘মি টু’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। এরপর একে একে মুখ খুলতে থাকেন হলিউডের নামিদামি তারকারাও।

এক পর্যায়ে এই ‘মি টু’ আন্দোলনের ঝড় ছড়িয়ে পড়ে পুরো বিশ্বে। ভলগা থেকে গঙ্গা মাড়িয়ে সম্প্রতি এই আন্দোলন বঙ্গের ভূমিতেও শেকড় গাড়ছে। এরইমধ্যে ভারতজুড়ে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে নারীদের ভার্চুয়াল আন্দোলন ‘#মি টু’ ঝড়ের কবলে পদত্যাগ করেছেন দেশটির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর। ২০০৮ সালে ‘হর্ন ওকে প্লিজ’ ছবির শ্যুটিং সেটে আপত্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির অভিযোগ তুলে গেল ৭ অক্টোবর বলিউডের শক্তিশালী অভিনেতা নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে প্রথম যৌন হেনস্তার অভিযোগ তোলেন সাবেক মিস ইন্ডিয়া বলি অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত। এরপর নারীর প্রতি সহিংসতা ও যৌন নিপীড়ন বিরোধী ‘মি টু’ আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠে গোটা বি-টাউন। একের পর এক খ্যাতিমান তারকাদের নামে যৌন হেনস্তার অভিযোগ আসতে থাকে। বলিউডের অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রীই এসময় তনুশ্রীর পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদে শামিল হন। স্রোতের বিপরীতেও দেখা যায় কাউকে কাউকে।

শুধু নানা পাটেকরই নন, সাম্প্রতিককালে বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও পরিচালক নন্দিতা দাসের বাবার বিরুদ্ধেও এমন অভিযোগ আনা হয়। বলিউডের প্রযোজক, পরিচালক, ডিরেক্টরদের পাশাপাশি অমিতাভ বচ্চন, সালমান খান, ভূষণ কুমার দের মত অনেক রথী-মহারথীও এই ‘মি-টু’ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।

হলিউড-বলিউড পেরিয়ে এই ‘মি টু’ আন্দোলনের ঢেউ এখন বাংলাদেশেও। সম্প্রতি দেশের তারকা অঙ্গন থেকে শুরু করে পেশাজীবী একাধিক নারী তাদের যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করার পর বাংলাদেশে ‘মি-টু’ আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়।

গত ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সাবেক মিস আয়ারল্যান্ড ও মডেল মাকসুদা আখতার প্রিয়তির সোশ্যাল মিডিয়ায় দেয়া এক পোস্টকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশেও ‘মি-টু’ ঝড় শুরু হয়। প্রিয়তির অভিযোগের তীর রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তৃণমূল আওয়ামী লীগ নেতা রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। রফিকুলের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ তোলে ভিডিও বার্তাসহ এক পোস্টে প্রিয়তি জানান, ২০১৫ সালের মে মাসে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান রফিকুলের কোম্পানির একটি পণ্যের বিজ্ঞাপনে কাজ করার পর পারিশ্রমিক আনতে গেলে রফিকুল তাকে অফিসেই যৌন নির্যাতন করেন। এ ঘটনায় মুখ না খুলতে প্রিয়তিকে কয়েক দফা জীবননাশেরও নাকি হুমকি দেয়া হয়। প্রিয়তি জানান, তিনি নিজের জীবন নিয়ে ঝুঁকিতে আছেন। এ ঘটনায় ইন্টারপোলের সাহায্য পেতে আইরিশ পুলিশের কাছে অভিযোগও করেছেন।

প্রিয়তির দাবি, রফিকুল ইসলামরা প্রভাবশালী, তারা মিডিয়াকেও নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এ নিয়ে কেউ ভয়ে নিউজ করবে না। তবে ইতোমধ্যেই রফিকুলকে ঘিরে এ ঘটনার বেশ কিছু প্রতিবেদন গণমাধ্যমে এসেছে। প্রিয়তি লিখেন ‘আমি শুধু এতটুকু বলতে চাই, পুরো ঘটনাটি লজ্জায় লিখতে পারিনি। কারণ ঘটনা এর চেয়েও ভয়াবহ ছিলো।’ তিনি খুন হলে এর জন্য রফিকুল দায়ি থাকবেন বলেও দাবি করেন প্রিয়তি।

পরবর্তীতে এ ঘটনাকে সম্পূর্ণ মিথ্যে ও বানোয়াট দাবি করে রফিকুলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রিয়তিকে তিনি চেনেন না। তার অফিসে যেসব মডেলরা কাজ করেন অনেকের সঙ্গে সরাসরি তার দেখাও হয় না।

সর্বশেষ খ্যাতনামা আবৃত্তিশিল্পী মাহিদুল ইসলামের অভিযোগের আঙুল তোলেন তার কাছে আবৃত্তির প্রশিক্ষণ নেয়া জাকিয়া সুলতানা মুক্তা। গত ১১ নভেম্বর নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ১০ বছর আগের সেই ঘটনার কথা বলেন জাকিয়া।

এর আগে গত ৮ নভেম্বর জার্নালিজম ট্রেইনিং অ্যান্ড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের (জেএটিআরআই) প্রধান জামিল আহমেদের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেন আসমাউল হুসনা নামের এক নারী। শুচিস্মিতা সিমন্তি নামের আরেক নারী তার মায়ের এক সময়কার বন্ধু-সহকর্মী সাংবাদিক প্রণব সাহার বিরুদ্ধে যৌন নিগ্রহের অভিযোগ তুলে ধরেন ফেসবুকে।

এরপর পাঠক সমাবেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল ইসলাম বিজুর বিরুদ্ধে একই অভিযোগ তোলেন ট্রান্সজেন্ডার শিল্পী তাসনুভা আনান শিশির। তবে রংধনুর রফিকুল ইসলামের মতো প্রণব সাহা, বিজু ও মাহিদুল ইসলামরাও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এই সময়ে চারপাশে চোখ কান খোলা রাখলে এমন আরও অনেককেই পাওয়া যাবে- যারা প্রতিদিন চলার পথে, কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। তবে লোকলজ্জার ভয়ে মুখ খুলছেন না অনেকেই।

এদিকে ‘মি টু’ আন্দোলনে জোর সমর্থন জানিয়ে ও আন্দোলনকে আরও অর্থবহ করে তুলতে গেল কয়েক দিনে রাজধানীতে বেশ কিছু মানববন্ধন ও আলোচনা সভা হয়েছে। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ‘#মি-টু’ আন্দোলনের ব্যানারে এক মানববন্ধনে বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের প্রেসিডেন্ট নাসিমুন আরা হক মিনু বলেছেন, ‘আমাদেরকে আওয়াজ তুলতে হবে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে। যারা যৌন হয়রানির শিকার তাদের পাশে গিয়ে আমাদের দাঁড়াতে হবে। যদি আমরা এখনও চুপ থাকি তাহলে যৌন হয়রানিকারীরা সাহস পেয়ে যাবে। এ আন্দোলন সব পুরুষদের বিরুদ্ধে নয়। এ আন্দোলন শুধুমাত্র যৌন নিপীড়নকারীদের বিরুদ্ধে।’

বাংলাদেশ মহিলা সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মমতাজ বিলকিস বলেন, ‘বাংলাদেশে মায়েরা লজ্জার ভয়ে তাদের ছোট মেয়েদের চুপ করিয়ে রাখে। এতে করে অপরাধীরা সাহস পেয়ে যাচ্ছে।’ যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে দেশের প্রচারমাধ্যম বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।

‘মি টু’ আন্দোলন সফল করতে ও নারীর প্রতি যৌন হেনস্তা প্রতিরোধে পুরুষের এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক কাবেরী গায়েন।

তিনি বলেন, ‘নারীদের যেকোনো হয়রানির বিরুদ্ধে আমাদের কণ্ঠস্বর জারি করতে হবে। অপরাধীদের প্রকাশ করতে হবে যেন তারা আবার অপরাধের পুনরাবৃত্তি না করতে পারে।’
‘মি টু’ আন্দোলনের ভবিষ্যত নিয়ে প্রশ্ন তুলে এক নারী সাংবাদিক জানান, তিনি নিজেও তার জ্যেষ্ঠ পুরুষ সহকর্মী দ্বারা যৌন হেনস্তার শিকার। তার ভাষ্য, ‘পাশের দেশের অনুকরণে ‘মি-টু’ মুভমেন্ট বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ঠিকই। কিন্তু সেই দেশেই এর কোনও পরিবর্তন এখনও আসেনি। মাঝখানে কিছু সুবিধাবাদী এই সুযোগটা নেয়।’

‘মি টু’ আন্দোলন প্রসঙ্গে বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল বলেন, ‘আমাদের সমাজে মেয়েদের কথার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এছাড়া ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়েও মানুষের মনে সন্দেহ আছে। এই সংস্কৃতিগুলোর সঙ্গে ‘মি-টু’র ভবিষ্যৎ জড়িয়ে।’ তবে তিনি মনে করেন, এইসব যৌন নিপীড়নের অভিযোগের সত্যতা তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে পারলে পরিস্থিতি অনেকটাই পাল্টে যাবে। নারীরাও তখন সাহস নিয়ে সামনে এগিয়ে আসবে। [তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট]

লেখক: কবি ও সংবাদকর্মী

সব সময় আপডেট নিউজ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন- সবুজ বিডি ২৪

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।